Skip to main content

শিশুদের মোবাইল আসক্তি পরিণতি ও করণীয়: শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও সভাপতি, বাংলাদেশ শিশু চিকিৎসক সমিতি।

 


শিশুদের মোবাইল আসক্তি পরিণতি ও করণীয়: শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও সভাপতি, বাংলাদেশ শিশু চিকিৎসক সমিতি।

নিঃসন্দেহে ডিজিটাল প্রযুক্তি তথা মোবাইল ফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ- এসব ডিভাইস সৃজনশীল এবং সুবিধাজনক। কিন্তু শিশুদের জন্য এটি বেশ বিপদজনক। এর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার অর্থাৎ অত্যধিক স্ক্রিন টাইম শৈশবের সামাজিক এবং মানসিক বিকাশের ওপর ভীষণ রকম ক্রমবর্ধমান বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব ফেলে। বাস্তব জীবনে, যেসব শিশু তাদের পর্দায় আসক্ত, তারা বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ক্রিয়াকলাপ যেমন- খেলাধুলা, দৌড়ানো বা সাইকেল চালানো মিস করে; ফলে তাদের দক্ষতা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তা ছাড়া মনোনিবেশ করার এবং বাস্তবজীবনে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করার ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই শিশুর স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ করতে এবং তাদের চোখের বিশ্রামের জন্য স্ক্রিন থেকে পর্যাপ্ত সময় বিরতি নিতে উপদেশ দিতে হবে। টিভি, মোবাইল গেম বা যে কোনো ধরনের ভার্চুয়াল এন্টারটেইনমেন্ট দেখার সময়ে আমাদের মস্তিষ্কের কোষ থেকে ডোপামিন নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণ হয়। এ ডোপামিন আমাদের মনে এক ভালোলাগার অনুভূতি সঞ্চার করে। তার ফলে অতি সহজেই আমরা এ ধরনের এন্টারটেইনমেন্ট মিডিয়ামগুলোতে আসক্ত হয়ে পড়ি।
আসক্তির পরিণতি:
* শিশু সময়মতো খেতে চাইবে না। এর ফলে অপুষ্টিতে ভুগবে, কারণ উপযুক্ত পরিমাণে খাদ্য গ্রহণ না করার কারণে অথবা সারাক্ষণ বসে-শুয়ে থাকার জন্য মোটা হয়ে যাবে।
* চোখ খারাপ হবে। ঘাড়ে ব্যথা হবে।
* জেদি, অতিচঞ্চল হয়ে উঠবে।
* পড়ালেখা ও কর্মজীবনের মান কমে যাবে।
* অতি উদ্বিগ্নতা, বিষণ্নতা এবং তীব্র মানসিক চাপের মতো মানসিক রোগ দেখা দিতে পারে।
* বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডারের সঙ্গে গেমিং ডিজঅর্ডার হওয়ার প্রবণতা কখনো বেশি পাওয়া গেছে।
* ইন্টারনেট বা গেমের বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে আচরণ পরিবর্তিত হয়ে যায়, আচরণে আগ্রাসীভাব দেখা দেবে। অল্পতেই রেগে যাবে। কখনো নিজের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বা অপরকে আঘাত অথবা হত্যা করার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে।
করণীয়:
* বাড়ির খুব দরকারি গ্যাজেটের মতো (ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ইত্যাদি) মোবাইল ফোনও একটি অতি প্রয়োজনীয় জিনিস, তবে বাচ্চার খেলার সামগ্রী নয়। বড় বাচ্চাদের বোঝানো উচিত টিভি বা মোবাইলের আসক্তির খারাপ দিকগুলো।
* বাচ্চাদের একাকিত্ব দূর করার চেষ্টা করুন। আজকাল বেশিরভাগই ছোট পরিবার। তাই বন্ধু ও পরিজনহীন বাড়িতে টিভিকেই তারা পরম বন্ধু করে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মা-বাবা দুজনই চাকরি বা অন্য কাজে অনেকটা সময় বাইরে থাকলে তাই বাচ্চা টিভি বা মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ে। বিকাল বেলায় বাচ্চার জন্য বিভিন্ন ধরনের অ্যাক্টিভিটির পরিকল্পনা করুন। যেমন- নাচ, গান, আবৃত্তি, মিউজিকাল ইন্সট্রুমেন্ট শেখানো। এভাবে সমবয়সি বাচ্চাদের সঙ্গে সময়ও কাটাতে পারবে, ওদের একাকিত্বও ঘুচবে।
* বাচ্চার মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করুন। তাহলে টিভি, মোবাইল বা ভিডিও গেমের আসক্তি থেকে অনেক সহজেই বাচ্চাকে দূরে রাখা যায়।
* মাঝে মধ্যে বাচ্চাদের নিয়ে খেলাধুলা করুন।
* অনেক সময় বিভিন্ন কার্টুন ক্যারেক্টারের মারপিট বা মোবাইল গেমের কার ক্র্যাশিং খেলা বাচ্চাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাঘাত ঘটায়। তারা অতিরিক্ত হাইপার অ্যাক্টিভ বা অ্যাগ্রেসিভ হয়ে ওঠে। তাই লক্ষ রাখুন, কী ধরনের প্রোগ্রাম বাচ্চারা দেখছে। সে ক্ষেত্রে বাচ্চার পাশে বসে ওকে সঠিক ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিন।
* বাচ্চাদের কম্পিউটার ব্যবহার করতে দিন সময় মেপে। ল্যাপটপ বা কম্পিউটার বাড়ির এমন একটি জায়গায় রাখুন, যাতে তা বড়দের চোখের সামনে থাকে। তাতে বাচ্চারা কী ধরনের বিষয় নিয়ে ইন্টারনেটে নাড়াচাড়া করছে তা নিয়ে একটা ধারণা পাওয়া যায়।
* বাচ্চার খাওয়ানোর সময় বা ঘুমোতে যাওয়ার আগে কোনো ধরনের গ্যাজেটের অভ্যাস রাখবেন না। বরং গল্প বলুন। তাতে বাচ্চা অনেক ধরনের প্রশ্ন করতে শিখবে, নতুন বিষয় সম্পর্কে শিখবে। ঘুমোতে যাওয়ার আগে মন বিক্ষিপ্ত থাকবে না।
নিজের ব্যস্ততার জন্য আদরের সন্তানকে মোবাইল গেমে, ভিডিওতে আসক্তি করবেন না। শিশুদের প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিয়ে যাওয়া খুব জরুরি। শিশুকে নিয়ে বাগানে বা প্রকৃতির মধ্যে খেলাধুলা করুন। তাতে শিশুরা সামাজিক হয়ে উঠতে পারবে। মানসিক বিকাশের উন্নতি হবে।
শিশুদের ঘরে কাজে ব্যস্ত রাখতে পারেন। বিশেষ করে মায়েরা এ কাজটি করতে পারেন। আপনার সন্তানকে ছোট ছোট কাজে সহযোগিতা করা শেখাতে পারেন। এতে আপনার সন্তান ঘরের কাজের প্রতি আগ্রহী হবে এবং মোবাইল আসক্তি থেকে সরে আসবে।

Comments

Popular posts from this blog

ফেসবুকের ক্ষতিকর দিকগুলো:

  ফেসবুকের ক্ষতিকর দিকগুলো: ফেসবুকের আবার ক্ষতি কি? এটি তো নিতান্তই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম। উপরন্তু ইদানীং এটিকে অনেকের ব্যবসা আর জীবিকার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করছেন। কত্ত পুরোনো বন্ধুদের খুঁজে পাওয়া যায় এই ফেসবুকে—যুক্ত থাকা যায় পৃথিবীর সব প্রান্তের সঙ্গে। জানা যায় অনেক কিছু, এমনকি সংবাদপত্র আর টেলিভিশনের চেয়েও দ্রুততর সময়ে হালনাগাদ তথ্যটি পাওয়া যায় ফেসবুকে। সবই তো ভালো। কথা সত্য। ফেসবুক সত্যিই ভালো। কিন্তু ‘ভালো’ভাবে এর ব্যবহার করতে না পরলে সমুদয় ক্ষতি। যেমন বিদ্যুতের কথাই ধরা যাক—বিদ্যুৎ কত উপকারী; বাতি জ্বলে, পাখা ঘোরে—বড় বড় কারখানা চলে বিদ্যুতে। কিন্তু একে ভালোবেসে বিদ্যুতের তার শরীরে জড়িয়ে রাখলে সমূহ বিপদ! তেমনি ফেসবুকের পরিমিত আর যৌক্তিক ব্যবহার করতে না পারলে ক্ষতি অনিবার্য। ফেসবুকের প্রধান ২১টি ক্ষতি হচ্ছে: ১. সময় নষ্ট : ফেসবুক ব্যবহারের দিক থেকে ঢাকা শহর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী। বাংলাদেশে প্রায় তিন কোটির কাছাকাছি ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছেন। ২০১৭ সালে তরুণদের ওপর পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী শুধু চ্যাটিংয়ের জন্য গড়ে প্রতিদিন ৮০ মিনিট করে ব্যয় করেন বাংলাদেশের তরুণেরা।...

অপরিকল্পিত মোবাইল ব‍্যবহারে আমাদের সন্তানের ভবিষ্যত অন্ধকার:

  অপরিকল্পিত মোবাইল ব ‍ ্যবহারে আমাদের সন্তানের ভবিষ্যত অন্ধকার: তথ্যপ্রযুক্তির এ সময়ে স্মার্টফোন নিত্যপ্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনা মহামারির লকডাউনের সময়ে এর ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ। প্রায়ই দেখা যায়, অভিভাবকরা বাচ্চাকে শান্ত রাখার জন্য তার হাতে স্মার্টফোন বা ট্যাব দেন। গান, কার্টুন বা মজার ভিডিও চালিয়ে দিয়ে তাকে শান্ত রাখা হয়। আবার স্কুল-কলেজসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাসের কারণে বাধ্য হয়েই শিশুর হাতে তুলে দিচ্ছেন স্মার্টফোন। দিনের অনেকটা সময় শিশুদের স্মার্টফোন হাতে থাকায় এক ধরনের আসক্তিতে রূপ নিয়েছে এটি। আজকের আয়োজনে শিশুদের স্মার্টফোন আসক্তি দূর করতে করণীয়সহ বিস্তারিত আলোচনা। বর্তমানে অনলাইন ক্লাস, বিনোদন ও কার্টুন- এসবের কারণে শিশুদের সিংহভাগ সময় কাটে স্মার্টফোনে। এখন শিশুরা সাধারণত মোবাইল, টেলিভিশন, স্মার্টফোন, ট্যাব ও ইউটিউবে সময় কাটায়। এটি অনেকেই ভালোভাবে দেখে। কিন্তু এ প্রযুক্তির কারণে শিশুদের মধ্যে নানাবিধ বিরূপ মনোভাব তৈরি হচ্ছে, এমনকি অতি অল্প বয়সেই তারা অ্যাডাল্ট বিভিন্ন কনটেন্ট দ্বারা উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। এভাবেই শিশুগুলো মোবাইলে অ্যাপসগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়ে যাচ্ছে...